• ঢাকা, বাংলাদেশ রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ০৫:৫৩ অপরাহ্ন

ছাত্ররাজনীতি চাই, চাই না

উমর ফারুক
সর্বশেষ: শনিবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৪

২০০১ সালের কথা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির রমরমা আস্তানা। চান্স পেলাম হিসাববিজ্ঞান বিভাগে। ভর্তিও হলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে যখন বেরোবো তখন মা বললেন, ‘রাজনীতি করবে না। ঠিক মতো পড়বে। খাবে। সময় নষ্ট করবে না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে পা দিতেই কানে এলো, ‘ধর ধর … ধর! ধইরা ধইরা জবাই কর!’ আমি শিউরে উঠলাম! এগুলো রাজনীতির ভাষা! এগুলো কোনও মানুষের ভাষা? অথচ সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেই ভাষায় রাজনীতি কথা বলছে।

সময় গড়িয়ে গেলো। আমার অনেক বন্ধু রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লো। মিছিলে গেলো। প্রথমবর্ষ থেকেই ওরা হলে থাকতে শুরু করলো। বাড়তি সুবিধা পেতে শুরু করলো। পকেটে কড়কড়ে নোট জমতে শুরু করলো। আমার এক বন্ধু ছিল। খুব গরিব পরিবারের সন্তান। কখনও খায়, কখনও না খেয়ে থাকে। হঠাৎ একদিন ছেলেটা হলে উঠে গেলো। দেখলাম ওর সাহস, শক্তি দুই-ই হঠাৎ বেড়ে গেছে। একদিন পকেট থেকে অস্ত্র বের করে দেখালো! আমি চমকে গেলাম।

আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি সন্তান যখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছে তখন তার মা বলে দিয়েছে, ‘বাবা রাজনীতি করবে না। ভালো করে পড়ো।’  ঠিক আমার মায়ের মতো। অর্থাৎ যে ছেলেটা রাজনীতিতে নাম লেখাচ্ছে ও ওর মায়ের কথার অবাধ্য হলো। অর্থাৎ দু-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া কেবল তারাই ছাত্ররাজনীতিতে জড়াচ্ছে যারা মায়ের অবাধ্য। মায়ের কথা শুনছে না। বলাবাহুল্য খানিকটা ডানপিটে স্বভাবের। একটু ভিন্নভাবে বললে, কেবল অবাধ্য ছেলেদের সংগঠন ছাত্ররাজনীতি। অথচ আমাদের মায়েরা যদি ছাত্ররাজনীতি করার অনুমতি দিতেন তাহলে এটি হয়ে উঠতো ‘মায়ের বাধ্য ছেলেদের ছাত্রসংগঠন’! কিন্তু মায়েরা কেন অনুমতি দিচ্ছেন না। কেন দেন না।

এবার আসি একটু ভিন্নপ্রসঙ্গে! আমাদের সমাজে, আমাদের সমাজ প্রেক্ষাপটে কি ছাত্ররাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ? প্রতিবছর প্রতিটি কর্মস্থলে কর্মসংস্থানের যেমন কিছু শূন্যতা তৈরি হয় তেমনি রাজনীতিতেও কিছু শূন্যতা তৈরি হয়। এসব পদ পূরণ করার দরকার পড়ে। একজন দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি না হলে যেমন সমাজে প্রকৌশলীর ঘাটতি দেখা দেবে, একজন দক্ষ ডাক্তার তৈরি না হলে যেমন সমাজে একজন দক্ষ চিকিৎসকের অভাব দেখা দেবে; তেমনি সমাজ যদি একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ তৈরি করতে ব্যর্থ হয় তাহলে সমাজে রাজনীতিবিদের সংকট দেখা দেবে!

রাজনীতি একটি দেশের মূল চালিকা শক্তি। একটি দেশের অর্থনীতি থেকে সংস্কৃতি সবটাই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। একটি দেশের মুক্তি সংগ্রাম সবটাই দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের ইতিহাস,  ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও  মুক্তির সংগ্রামের সাথেও মিশে আছে ছাত্ররাজনীতি। আমাদের ছাত্ররাজনীতির একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে। রয়েছে অনেক অনন্য ঐতিহাসিক অর্জন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে এদেশে ছাত্ররাজনীতি।

এবার একটু আমার শ্রেণিকক্ষ থেকে ঘুরে আসি।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান আমার শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থী। মাহমুদ অত্যন্ত বিনয়ী ও ভদ্র। একাডেমিক কোনও কাজে ও কখনও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করতো না। কখনও কারও জন্য আমার কাছে সুপারিশ করেছে বলেও মনে পড়ে না। মাহমুদ ছাত্র হিসেবে খুব একটা সামনের কাতারের ছিল না। বসতো পেছনের বেঞ্চে। বিশ্বাস থেকেই বলতাম, ‘মাহমুদ রাজনীতিটা অন্তত ঠিক মতো করো। একদিন তুমি শিক্ষামন্ত্রী হবে। আমি মানুষকে গর্ব করে বলবো তুমি আমার শ্রেণিকক্ষের ছাত্র।’  কথাটার মধ্যে এক ধরনের আবেগ ছিল, বিদ্রুপ ছিল, আনন্দও ছিল বোধকরি। মাহমুদ কখনও শিক্ষামন্ত্রী হবে কিনা আমি জানি না! তবে হলে অবাক হবো না। আমার ক্লাসের অপেক্ষাকৃত মেধাবীরা যখন রাজনীতি বিমুখ। জায়গাটা ছেড়ে দিয়েছে, তখন মাহমুদ শিক্ষামন্ত্রী হলে আপত্তি কেন? অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা মন্ত্রী হবে, আর মেধাবীরা তাদের অধীনে কেরানিগিরি করবে এটা তো আমরা মেনেই নিয়েছি।

এবার মোদ্দাকথায় আসি। বুয়েটে কী ছাত্ররাজনীতি দরকার? কেন দরকার? অথবা কেন দরকার নয়? ধরে নিলাম বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নেই। এবার আমাদের একজন মন্ত্রী দরকার, মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সমিটির সদস্য দরকার। কোথায় পাবেন? তখন যদি একজন আইনজীবীকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, কিংবা বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাহলে বিতর্ক তুলবেন না প্লিজ। এই লেখা এখনও পর্যন্ত ছাত্ররাজনীতিকে সমর্থন করছে। কিন্তু সেই ছাত্র রাজনীতি কি প্রচলিত ভাগাভাগির রাজনীতি? সেই রাজনীতি কী ‘ধর.. ধর..’ শ্লোগানের রাজনীতি?

না সেই রাজনীতির সমর্থন আমরা কেউই করি না। করতে চাই না। প্রচলিত ছাত্ররাজনীতি নেতিবাচক দিকগুলো সন্দেহাতীতভাবে পরিহারযোগ্য। বিতর্কটা আরেকটু এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। আচ্ছা উন্নত বিশ্বে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কি আমাদের দেশের মতো প্রচলিত ছাত্ররাজনীতি আছে? যদি না থাকে তাহলে কি তারা নেতৃত্ব সংকটে পড়ে? তাহলে আমাদের কেন প্রয়োজন?

সত্যিটা হলো উন্নতবিশ্বে আমাদের মতো প্রচলিত ছাত্ররাজনীতি সব জায়গায় নেই। কিন্তু তাদের দেশে নেতৃত্ব তৈরির নানান কৌশল আছে, ভিন্ন কৌশল আছে। ফলে তারা নেতৃত্ব সংকটে পড়ে না। অথচ আমরা নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে অনেকটা পিছিয়ে। এমন কী আমাদের ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোও বন্ধ হয়ে আছে দীর্ঘদিনযাবত।

আমাদের নেতৃত্বের বিকাশ দরকার। সেই নেতৃত্বের বিকাশের জন্য যতক্ষণ না বিকল্প কোনও পথ স্থির করতে পারছি ততক্ষণ ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা বোকামি হবে। বুয়েটের আবরারকে যেমন আমরা ভুলতে পারিনি, তেমনি ভুলতে পারিনি দ্বীপকে, ভুলতে পারিনি অভিজিতকে। সমাজে খাদ্য সংকট যেমন ভয়ংকর, সংস্কৃতির সংকট যেমন ভয়ংকর, তার চেয়েও বেশি ভয়ংকর নেতৃত্ব সংকট। কেবল নেতৃত্ব সংকটই একটি দেশকে শূন্যে নামিয়ে আনতে পারে। অতএব, যতক্ষণ না বিকল্প স্থির প্রক্রিয়ায় দক্ষ নেতৃত্ব তৈরি করা সম্ভব, ততক্ষণ ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা বোকামি। তবে একই সাথে প্রচলিত ছাত্ররাজনীতির খারাপ দিকগুলো সংশোধন অধিকতর জরুরি বোধ করি।

‘ধর.. ধর..’ দর্শননির্ভর ছাত্ররাজনীতি কোনও অবস্থাতেই একটি দেশের জন্য, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য কাম্য নয়।

লেখক: শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস্ বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর


আরো খবর