• ঢাকা, বাংলাদেশ মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ০৯:০৭ পূর্বাহ্ন
নোটিশ
রাজশাহীতে আমরাই প্রথম পূর্ণঙ্গ ই-পেপারে। ভিজিট করুন epaper.rajshahisangbad.com

মর্নিং স্কুল চালানোর ছয় সুবিধা উল্লেখ করে নওগাঁ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ফেইসবুকে পোস্ট 

নওগাঁ প্রতিনিধি
সর্বশেষ: বুধবার, ১ মে, ২০২৪

চলমান প্রচন্ড গরম ও তীব্র তাপদাহের কারণে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। এই গরমের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে সর্দি-জ্বরসহ ডায়েরিয়া জনিত রোগ। বর্তমানে এই তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে শিক্ষার্থীদের শ্রেণী কার্যক্রম নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা।
এমন সময়ে নওগাঁ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ফেইসবুকে দেওয়া পোস্ট নিয়ে আশার আলো দেখছেন নওগাঁর শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তাঁর ফেইসবুক আইডিতে গতকাল মর্নিং স্কুল চালানোর ছয় সুবিধা উল্লেখ করে পোস্ট দিয়েছেন। সেই পোস্টে ইতোমধ্যে ২৪১জন সমর্থন জানিয়ে সকালে স্কুল-মাদ্রাসা চালানোর জন্য কমেন্ট করেছেন।
পাঠকদের জন্য জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পোস্টটি হুবুহু তুলে ধরা হলো, “Morning School বা প্রাতঃকালীন বিদ্যালয় শব্দটির সঙ্গে আমরা সকলেই পরিচিত। বাল্যকাল থেকে দেখে আসছি গ্রীষ্মকালে প্রখর রোদের হাত থেকে শিক্ষক কর্মচারী ও কমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে এড়াতে মর্নিং স্কুলের প্রচলন ছিল। বর্তমানে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ এক বাক্যে স্বীকার করবেন  তার ছাত্র জীবনে অন্তত দু একবার পরীক্ষায় মর্নিং স্কুল চালু করার আবেদন জানিয়ে প্রধান শিক্ষক বরাবর একখানা আবেদন পত্র লিখেছেন অথবা উক্ত বিষয়ে আবেদনপত্র লেখার নিয়ম কানুন সহ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন।
অতীতের সে সময়ের চেয়ে বর্তমান সময়ে এর প্রাসঙ্গিকতা,ব্যাপ্তি ও প্রয়োজনীয়তা আরো বেড়েছে। ডাবল শিফট (সরকারি- বেসরকারি) স্কুলের দিকে তাকালে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। মর্নিং শিফটে শিক্ষার্থী ভর্তির চাহিদা অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাধ্য না হলে কোন অভিভাবক তার সন্তানকে দিবা শিফটে পড়াতে চান না।প্রতিষ্ঠান প্রধানকে এ বিষয়ে চাপের মধ্যে পড়তে হয়। কখনো কখনো আবার তদবির সামলাতে হয়।
বিগত এক দশকে দেশের রাস্তাঘাট, ব্রীজ, কালভার্ট এর প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। বিদ্যালয় সমূহের অবকাঠামো ও শ্রী বৃদ্ধি হয়েছে। স্কুল,  কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা উত্তরাত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। দু এক কিলো মিটারের মধ্যে কোন না কোন প্রতিষ্ঠানের দেখা মিলে।শিক্ষার্থীরা অল্প সময়ে তার প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারে।
বর্তমানে হিট ওয়েভ চলছে এবং হিট স্ট্রোকে জন মৃত্যু ঘটছে।রাস্তায় পিচ গলছে। পথচারীর জুতা-স্যান্ডেল আটকাচ্ছে। মাঠ ঘাট চৌচির,  জল নেই পুকুরে। বৃষ্টির জন্য মানুষ আকাশের পানে চেয়ে  আছে। কোথাও বা ব্যাঙের বিয়ে, (আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দে রে তুই আল্লাহ—- নামক গীত শোনা যাচ্ছে ) কোথাও বা বৃষ্টির প্রার্থনায় ইসতিসকার নামাজের আয়োজন করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় মর্নিং স্কুল চালু করলে ছাত্র -অভিভাবক, শিক্ষক -কর্মচারী সাধুবাদ জানাবে বলে মনে করি।
মানুষের কাছে বর্তমানে সময়ের মূল্য বহুগুণে বেড়েছে। মানুষ পরিশ্রমের মূল্য দিতে শিখছে। পরিশ্রম এর মূল্য বৃদ্ধি মানেই অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়া। আর অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়া মানে দেশ উন্নয়ন, অগ্রগতিতে এগিয়ে যাওয়া। এ প্রেক্ষাপটে আমাদের ছাত্র- ছাত্রীদের পরিশ্রমী ও কষ্ট  সহিষ্ণু হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। আর তা করতে হলে মর্নিং স্কুলের বিকল্প নেই।
বর্তমানে অতি ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়ার টেবিলে বসার মানসিকতা শিক্ষার্থীরা দিন দিন হারাচ্ছে। তারা রাতের প্রথমভাগ টিভি, নাটক, সিনেমা দেখা বা মোবাইল ফোন নাড়াচাড়ার মধ্য দিয়ে কাটাচ্ছে এবং দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যেস গড়ে তুলছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের যেমন স্বাস্থ্য হানি  ঘটছে, মেজাজ খিটখিটে হচ্ছে, তেমনি শ্রম বিমুখ হয়ে গড়ে উঠছে।এর প্রতিফলন বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা, নিয়োগ পরীক্ষা বা ভাইবা বোর্ডে প্রতিফলিত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে সবসময়ই আইসিটি নির্ভর অনলাইন ক্লাসের পক্ষপাতি। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে    অনলাইন ক্লাস মন্দের ভালো বা নাই মামার চেয়ে  কানা মামা ভালো এরূপ একটি বিষয়। অনেক শিক্ষক অনলাইন ক্লাস করতে অভ্যস্ত নন বা নিজেকে শতভাগ প্রস্তুত করতে পারেননি। অনেকে কম্পিউটার বা টাচ মোবাইল ব্যবহারে পারদর্শী নন।
গুগল মিট বা জুম অ্যাপস সম্পর্কে ধারণা নেই। মোটকথা আইসিটি জ্ঞান নেই। যাদের আইসিটি  জ্ঞান  আছে, তারা ডাটা ক্রয়ে পয়সার এবং বিদ্যুতের লোডশেডিং এর অজুহাত তুলতে পারে।  অভিভাবক বা  শিক্ষার্থীদের নিকটও পর্যাপ্ত মোবাইল বা কম্পিউটারের অভাব রয়েছে।এতে  করে তারাও এ বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করতে পারে। শিক্ষার্থীরা নতুন করে মোবাইল বা কম্পিউটার ক্রয়ের জন্য অভিভাবকদের  উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এতে করে অভিভাবকদের অতিরিক্ত  টাকা পয়সা খরচের প্রয়োজন পড়বে। যা আমাদের নতুন কারিকুলাম বিস্তরণে  নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শ্রেণি নির্ঘণ্ট একক শিফট স্কুল সকাল ১০ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত, যার মধ্যে ১-১.৪৫মি.পর্যন্ত ৪৫ মি.টিফিন বিরতি। আর ডাবল শিফট স্কুল   সকাল ৭.৩০টা থেকে বিকেল ৫.৩০মি. পর্যন্ত চলে।যার মধ্যে উভয় শিফটের জন্য ২৫মি. করে টিফিন টাইম বরাদ্দ হয়েছে।
এ শ্রেণি নির্ঘণ্টে টিফিন একটি সমস্যা -বর্তমান সময়ে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত টিফিন ফি আদায় পূর্বক মানসম্মত টিফিন প্রদান করা বা মিড ডে মিল চালু করা কষ্টকর। অপরপক্ষে  বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের দ্বারা যে সকল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকে তার  ৮০ থেকে ৯০ ভাগ টিফিন পিরিয়ডে  সংগঠিত হয়। একশিফট স্কুলে টিফিন পিরিয়ডে শিক্ষক কর্মচারীগণ নামাজ ও খাওয়া দাওয়ায় ব্যস্ত থাকেন।
এ সময় দুষ্টু শিক্ষার্থী কর্তৃক বিদ্যালয়ের চেয়ার-টেবিল,চক- ডাস্টার, ব্ল্যাকবোর্ড,  বৈদ্যুতিক পাখা, বৈদ্যুতিক সুইচ ও বিদ্যুতের লাইন ক্ষতি গ্রস্ত হয়ে থাকে। বাথরুমের দরজা – জানালা, সাবানকেস,পানির ট্যাপ,বদনা, লুকিং গ্লাস, এমনকি প্যানসমূহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। এ সময় দুষ্টু শিক্ষার্থী কর্তৃক নিরীহ শিক্ষার্থীরা নির্যাতনের শিকার হয়। এক শিক্ষার্থী আরেক শিক্ষার্থীকে মারধর  করা, নিরবে চাঁদা আদায়ের মতো ঘটনা ঘটে থাকে।এ সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে রেষারেষি, আমিত্ব প্রকাশ এবং এক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মারধরের মত ঘটনা ঘটে থাকে। এ সময় দুষ্টু শিক্ষার্থীরা রাস্তায় সাইকেল নিয়ে ঘোরাঘুরি করে, মেয়েদের উত্যক্ত করে।এরা নদীর ধার, পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ঢুকে পড়ে। চিপায় চাপায়  বসে  ধূমপান করে। স্কুল পালানোর ঘটনা সর্বাধিক এ সময়েই ঘটে থাকে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে অতিসত্বর মর্নিং স্কুল চালু করা দরকার।
 একশিফট স্কুল সকাল ৭.৩০ মি. থেকে দুপুর ২.০০ টা পর্যন্ত এবং ডাবল শিফট স্কুলে যেমন শ্রেণি নির্ঘন্ট চলমান রয়েছে, তেমনটিই বহাল রাখা যেতে পারে। মর্নিং স্কুলের ব্যাপ্তি ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় অর্ধ থেকে নভেম্বরের প্রথম অর্ধ পর্যন্ত ৯  মাস  বহাল করা যেতে পারে।অবশিষ্ট তিন মাস শীতের প্রকোপ বেশি থাকে এবং ফুল ক্লাস চালানোর প্রয়োজন নেই।  নভেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ৩১ডিসেম্বর পর্যন্ত  বার্ষিক পরীক্ষা বা মূল্যায়ন, ব্যানবেইজ কর্তৃক শিক্ষা জরিপের তথ্য হালনাগাদকরণ, শীতকালীন অবকাশ এবং পরবর্তী বছরের জন্য শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম চালানো  যেতে পারে। বছরের প্রথম দিবস(১ জানুয়ারি)  পাঠ্যপুস্তক বিতরণ উৎসব হিসেবে পালন করত: মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সীমিত ক্লাসের পাশাপাশি কো- কারিকুলার এক্টিভিটিস যেমন বার্ষিক মিলাদ মাহফিল,ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও বিভিন্ন পুরস্কার বিতরণী  অনুষ্ঠান,Institute Management system (IMS) এর তথ্য হালনাগাদ করণ সহ শিক্ষার্থীদের ষষ্ঠ থেকে দশম  শ্রেণীর রেজিস্ট্রেশনকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।
মর্নিং স্কুল চালু করা গেলে নিচের সুফলগুলো পাওয়া যাবে মর্মে আমি মনে করি —
১.শিক্ষার্থীদের মধ্যে সকালে ঘুম থেকে ওঠার সদ-অভ্যেস গড়ে উঠবে।
২.সকালে ঘুম থেকে উঠে সরাসরি প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হবে কোচিং বা প্রাইভেটে যাওয়ার চিন্তা মাথায় আনার সুযোগ থাকবে না।
৩.হালকা জলযোগের জন্য ২০-২৫মিনিটের বিরতি রাখলে অনেক ক্রাইম ছাত্রদের দ্বারা সংগঠিত হবে না এবং স্কুল পালানোর প্রবণতা হ্রাস পাবে।
৪.বিকালে শিক্ষার্থীরা মুক্ত মনে খেলাধুলা/শারীরিক কসরত করতে পারবে। এতে করে তারা তাদের স্বাস্থ্য গঠনের সুযোগ পাবে।
.৫. বিকেলে খেলাধুলা/ শারীরিক কসরত করার ফলে ফুরফুরে মেজাজে সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে বসতে পারবে।
.৬. আমাদের নতুন কারিকুলাম এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জিত হবে।


আরো খবর